সংগ্রাম থেকে বলিউডের শীর্ষ নায়িকা
আজ ৩১ জুলাই বলিউড অভিনেত্রী কিয়ারা আদভানির জন্মদিন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তেমন সাফল্য না পেলেও ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতায় জায়গা করে নিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারিতে। বর্তমানে একটি ছবির জন্য তিনি প্রায় ২১ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নেন। এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, অভিনয়জীবন এবং সাম্প্রতিক নানা আলোচিত বিষয়।
নাম বদলের গল্প
১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন কিয়ারা আদভানি। জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল আলিয়া আদভানি। তবে বলিউডে অভিষেকের আগে নিজের নাম পরিবর্তন করে কিয়ারা রাখেন। কারণ তখন আলিয়া ভাট ইতোমধ্যেই বলিউডে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। দর্শকদের বিভ্রান্তি এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
যদিও তাঁর পরিবার সরাসরি চলচ্চিত্র অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তবু বলিউডের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল কিয়ারার।
প্রথম দিকের লড়াই
২০১৪ সালে ‘ফাগলি’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন কিয়ারা। ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে।
দুই বছর পর ‘এম.এস. ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করে আরও বেশি পরিচিতি পান। যদিও সেটি ছিল সহ-অভিনেত্রীর চরিত্র, তবুও দর্শকদের মনে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে সক্ষম হন।
‘কবির সিং’ বদলে দেয় ক্যারিয়ার
২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কবির সিং’ কিয়ারার জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। ছবিতে প্রীতি চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যান তিনি। সিনেমাটি নানা বিতর্কের জন্ম দিলেও কিয়ারার অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘গুড নিউজ’, ‘শেরশাহ’, ‘ভুল ভুলাইয়া ২’ এবং ‘সত্যপ্রেম কি কথা’সহ একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে তিনি বলিউডের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় অভিনেত্রীতে পরিণত হন।
প্রেম থেকে সংসার
‘শেরশাহ’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় থেকেই অভিনেতা সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে কিয়ারার সম্পর্কের সূচনা হয়। দীর্ঘদিন নিজেদের সম্পর্ক ব্যক্তিগত রাখলেও শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে রাজস্থানের জয়সালমিরে রাজকীয় আয়োজনে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন এই তারকা জুটি।
তাঁদের বিয়ের ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পড়ে এবং সেটি বছরের অন্যতম আলোচিত সেলিব্রিটি বিয়েতে পরিণত হয়।
মাতৃত্বের নতুন অধ্যায়
বিয়ের পরও একাধিক বড় বাজেটের সিনেমায় কাজ চালিয়ে যান কিয়ারা। তবে মা হওয়ার পর নিজের অগ্রাধিকার বদলে ফেলেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য কয়েকটি বড় প্রজেক্ট থেকেও সরে দাঁড়ান।
গত বছরের জুলাইয়ে স্বামী সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে তাঁদের প্রথম কন্যাসন্তানের জন্মের সুখবর প্রকাশ করেন এই দম্পতি। সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তাঁরা জানান, মেয়ের আগমনে তাঁদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
পোস্টপার্টাম নিয়ে আবেগঘন স্বীকারোক্তি
সম্প্রতি উদ্যোক্তা ও পডকাস্ট সঞ্চালক রাজ শামানির অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে মাতৃত্ব-পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন কিয়ারা।
তিনি জানান, সন্তান জন্মের পর একজন নারীর মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে সমাজে খুব কম আলোচনা হয়। অথচ এটি জীবনের অন্যতম বড় পরিবর্তনের সময়।
আবেগাপ্লুত হয়ে কিয়ারা বলেন, নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁর প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছে। এই সময়ে তিনি নিজেকে সব সময় একটি কথাই মনে করিয়ে দিতেন—নিজের প্রতিও সহানুভূতিশীল হতে হবে।
তাঁর ভাষায়, সন্তান জন্মের পর নিজের প্রয়োজনের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। কারণ প্রথম কয়েক মাসের পুরো সময়টাই কেটে যায় শিশুর যত্ন, ঘুম, খাওয়া এবং দৈনন্দিন দেখভালে।
তিনি আরও বলেন, সেই সময় তিনি এমন একজন মানুষের উপস্থিতি চেয়েছিলেন, যিনি কোনো উপদেশ না দিয়ে শুধু তাঁর অনুভূতিগুলো মন দিয়ে শুনবেন।
কিয়ারা স্বীকার করেন, মাতৃত্বের প্রথম দিকে খুব ছোট ছোট বিষয়েও তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন এবং অনেক সময় কান্না আটকে রাখতে পারতেন না।
তবে এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা, অযথা আত্মসমালোচনা বন্ধ করা এবং ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখার বিষয়গুলোও এই সময়েই উপলব্ধি করেছেন তিনি।
‘টক্সিক’ সিনেমা ঘিরে বিতর্ক
অভিনেতা যশের সঙ্গে কিয়ারার নতুন সিনেমা ‘টক্সিক’ মুক্তির আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
প্রথমে টিজারের কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরে ‘তাবাহি’ গান প্রকাশের পর যশ ও কিয়ারার ঘনিষ্ঠ রোমান্টিক দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
অনেকেই মন্তব্য করেন, বিয়ে ও সন্তান হওয়ার পর এমন দৃশ্যে অভিনয় করা উচিত হয়নি কিয়ারার। তবে এই সমালোচনার পাল্টা জবাব দেন সহ-অভিনেতা বেনেডিক্ট গ্যারেট। তাঁর মতে, যশও বিবাহিত এবং সন্তানের বাবা। তাহলে শুধুমাত্র কিয়ারাকেই কেন সমালোচনার মুখে পড়তে হবে? তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমর্থন পায়।
পরিচালক গীতু মোহনদাসের ভিন্নধর্মী কাজের অভিজ্ঞতা
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা গীতু মোহনদাস পরিচালিত ‘টক্সিক’ সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও সম্প্রতি কথা বলেছেন কিয়ারা।
তিনি জানান, পরিচালক শুরু থেকেই চেয়েছিলেন, শুটিং সেটে পৌঁছানোর পর যেন তিনি পুরোপুরি চরিত্রের মধ্যেই থাকেন। এমনকি কারও সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময় করতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল তাঁকে।
শুরুর দিকে বিষয়টি তাঁর কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেও পরে বুঝতে পারেন, চরিত্রের আবেগ ও মানসিক অবস্থাকে বাস্তবভাবে ধরে রাখার জন্যই এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন পরিচালক।
শেষ পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়কে আরও গভীর করেছে বলেই মনে করেন কিয়ারা। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে চরিত্রের অনুভূতির মধ্যে থাকা অভিনয়কে আরও বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
আজ জন্মদিনে কিয়ারা আদভানিকে ঘিরে আলোচনার মূল কারণ শুধু তাঁর অভিনয়জীবন নয়; ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করার গল্পও তাঁকে ভক্তদের কাছে আরও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তুলেছে।
