রাজধানীতে গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড এখনো রহস্যের জট খুলতে পারেনি। এসব ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—অনেক হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে ভুক্তভোগীদের নিজ বাসার ভেতরে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও খুনের কারণ, জড়িতদের পরিচয় কিংবা হত্যার নেপথ্যের ঘটনা স্পষ্ট হয়নি। ফলে নিহতদের স্বজনদের অপেক্ষা আর হতাশা দিন দিন বাড়ছে।
দুই বছর আগে রাজধানীর রামপুরার মহানগর আবাসিক এলাকার নিজ বাসা থেকে আইনজীবী ফাহমিদা আক্তারের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এত সময় পেরিয়ে গেলেও তার হত্যার রহস্যের কোনো দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। স্বজনদের অভিযোগ, ফাহমিদা বাইরে নয়, নিজের বাসার ভেতরেই নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন। অথচ কারা তাকে হত্যা করেছে কিংবা কী কারণে তাকে প্রাণ দিতে হলো—আজও তারা জানতে পারেননি।
ফাহমিদার ঘটনা একা নয়। রাজধানীতে গত কয়েক বছরে অন্তত আটটি বাসায় ১৫ জন হত্যার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। প্রতিটি ঘটনায় শুরুতে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে অনেক মামলার তদন্ত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ঘটনায় একাধিকবার তদন্ত সংস্থা ও কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে বিচার তো দূরের কথা, অনেক মামলায় এখনো খুনের রহস্যই উদ্ঘাটিত হয়নি।
আলোচিত ১৫ হত্যাকাণ্ড
বাসার ভেতরে সংঘটিত আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগের একটি বাসায় স্কুলছাত্রী তাসনিম রহমান করবীকে শ্বাসরোধ ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট রামপুরার ওয়াপদা রোডের বাসায় গুলি করে হত্যা করা হয় সিআইডির অবসরপ্রাপ্ত এএসপি ফজলুল করিমকে। একই বছরের ২১ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার গোপীবাগে ঘটে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। সেখানে কথিত পীর লুৎফোর রহমান ফারুক, তার ছেলেসহ ছয়জনকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
এর পরের বছর, ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাসায় খুন হন টেলিভিশনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী।
২০১৫ সালের ১৩ মে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটে গৃহবধূ সুইটি আক্তার ও তার মামা আমিনুল ইসলাম হত্যার শিকার হন। একই বছর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় আইনজীবী ফাহমিদা আক্তারের হাত-পা বাঁধা মরদেহ।
এ ছাড়া গত বছরের ১ নভেম্বর মগবাজারের মধুবাগ এলাকায় নিজ বাসার ভেতর গলা কেটে হত্যা করা হয় গৃহবধূ ডলি রানী বণিককে।
এসব ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় তারা হতাশ। তাদের অনেকের অভিযোগ, তদন্তকারী সংস্থার গাফিলতি ও যথাযথ উদ্যোগের অভাবেই মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
গোপীবাগের ছয় খুনের মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্য কয়েকটি হত্যা মামলা প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে ডিবির হাত ঘুরে বর্তমানে সিআইডির তদন্তাধীন রয়েছে।
তদন্তে যুক্ত বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই ছিল অনেকটা ‘ক্লুবিহীন’। ফলে খুনিদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। অনেক ঘটনায় শুরুতেই প্রয়োজনীয় আলামত যথাযথভাবে সংগ্রহ করা যায়নি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিবেশ ও আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তদন্ত আরও কঠিন হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, পুরনো মামলাগুলোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত তদন্তও আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না। যাদের সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ডিভাইসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে পুরনো তথ্যের ওপর নির্ভর করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিছু ঘটনায় সন্দেহভাজন বা সম্ভাব্য খুনির পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও তাদের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, নতুন নতুন মামলার চাপ সামলাতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা পুরনো চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না বলেও জানিয়েছেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, মামলাগুলোর তদন্ত বন্ধ হয়নি এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ চলছে। তবে নিহতদের স্বজনদের প্রশ্ন এখনো একই—নিজের ঘরের ভেতরেই যারা নির্মম হত্যার শিকার হলেন, তাদের হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
