উপমহাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নূরজাহানের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেই তিনি অভিনয় ও সংগীতের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। আজ তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে।
১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্ম নেন নূরজাহান। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। মাত্র ছয় বছর বয়সে সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি। পরে শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে কাজের মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়।
চল্লিশের দশকে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে নূরজাহানের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ‘খানদান’, ‘জিনাত’, ‘আনমোল ঘড়ি’ ও ‘জুগনু’র মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিচিত তারকায় পরিণত হন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর গানের জনপ্রিয়তাও ছিল ব্যাপক।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর স্বামী ও চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভির সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যান নূরজাহান। নতুন দেশে গিয়ে তাঁকে আবার ক্যারিয়ার শুরু করতে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
পাকিস্তানে নূরজাহান শুধু অভিনেত্রী ও গায়িকা হিসেবেই কাজ করেননি। চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৫১ সালের ‘চানভে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে অভিনয় থেকে সরে এসে পুরোপুরি সংগীতে মনোযোগ দেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য গান জনপ্রিয় হয়। পাকিস্তানে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে অন্য অনেক গায়িকা একটি গানের জন্য যেখানে প্রায় ৩৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, সেখানে নূরজাহান প্রায় ২ হাজার রুপি দাবি করতেন—অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলোও পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ উপাধি যুক্ত হয়।
ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরও নূরজাহানের গানের প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথা জানিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে দীর্ঘ বিরতির পর ভারতে ফিরে এসেছিলেন নূরজাহান।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর করাচিতে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান নূরজাহান। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার আজও ভারত ও পাকিস্তানের সংগীত-চলচ্চিত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
