কুমিল্লার দেবিদ্বারে ফরিদা ইয়াসমিন (৫০) নামে এক নারীকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডিত করে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থল থেকে ৯টি পলিথিনে মোড়ানো মরদেহের অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত মরদেহের মাথা ও পায়ের অংশের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় লাইলী আক্তার (৩৩) নামে এক নারী ভাড়াটিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। স্থানীয়দের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ওই নারী হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে দেবিদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার ভূঁইয়া হাউজে ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফরিদা ইয়াসমিন ওই বাড়ির বাসিন্দা এবং মো. মফিজুল ইসলামের স্ত্রী।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর ধরে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন ফরিদা। তার স্বামী চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে তিনি বাড়িতে একাই থাকতেন। সম্প্রতি বাড়ির একটি কক্ষ লাইলী আক্তারের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়।
শনিবার সকালে ফরিদার স্বামী চট্টগ্রাম থেকে স্ত্রীকে ফোন করেন। একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে না পেরে তিনি ছোট মেয়েকে বাড়িতে গিয়ে মায়ের খোঁজ নিতে বলেন। পরে মেয়ে মরিয়ম আক্তার বাড়িতে গিয়ে মাকে না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেন।
মরিয়ম থানায় গিয়ে নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে চাইলেও ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ না হওয়ায় তখন পুলিশ তা নেয়নি। এরপর তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। এদিকে ফরিদার দেবর ছিদ্দিকুর রহমান নিখোঁজের খবর জানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং শুরু করেন।
বাড়িতে ফিরে মরিয়ম বারান্দা ধোয়া ও ভেজা অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বিকেলের দিকে ফরিদার ভাগনে মামুন বাড়ির পেছনে পলিথিনে মোড়ানো কয়েকটি প্যাকেট দেখতে পান। সন্দেহ হওয়ায় তিনি পুলিশকে খবর দেন।
খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা বাড়ির ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের সময় লাইলী হত্যার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। এরপর উত্তেজিত জনতা তাকে গণধোলাই দিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখেন।
পরে রাত সাড়ে সাতটার দিকে দেবিদ্বার থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পলিথিনে মোড়ানো ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করে। এসব প্যাকেটের মধ্যে ফরিদার খণ্ডিত মরদেহের বিভিন্ন অংশ ছিল বলে পুলিশ জানায়। পরে আটক লাইলী আক্তারকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
নিহতের স্বামী মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, সকালে অনেকবার ফোন করেও স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। পরে মেয়েকে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন। বাড়িতে গিয়ে বারান্দা ধোয়া অবস্থায় পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে ভাড়াটিয়া নারীর কথাবার্তায় অসংগতি দেখা দিলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
মফিজুলের দাবি, তার স্ত্রীর শরীরে স্বর্ণালংকার ছিল। সেগুলোর প্রতি লোভ থেকেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। তিনি জানান, মরদেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার হলেও এখনো মাথা ও পায়ের অংশ পাওয়া যায়নি।
নিহতের দেবর ছিদ্দিকুর রহমান জানান, মাইকিং করার সময় তিনি হত্যাকাণ্ডের খবর পান। দ্রুত বাড়িতে এসে পেছনের দিকে গিয়ে পলিথিনে মোড়ানো কয়েকটি প্যাকেট দেখতে পান। প্রথমে সেগুলো মানুষের দেহের অংশ হতে পারে—এমনটা তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে জানা গেছে, লাইলী আক্তারের পাশাপাশি তার স্বামী মো. আবুল কালাম আজাদ এবং রবিউল, সোহেল ও ইমন নামে আরও তিন যুবক এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থল থেকে পলিথিনে মোড়ানো মরদেহের ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মাথা ও পায়ের অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আটক লাইলী আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, স্বর্ণালংকারের লোভে ফরিদা ইয়াসমিনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
